দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিষখালী ও গজালিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রানাপাশা ইউনিয়নের ইসলামাবাদ গ্রাম মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় দ্বীপে পরিণত হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় চিকিৎসা, শিক্ষা, বাজার ও সরকারি সেবাসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে নৌকাই এখন একমাত্র ভরসা। গ্রামটিতে বর্তমানে মাত্র ৪৫টি পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১৬ সালের ভয়াবহ নদীভাঙনের পর ইসলামাবাদের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের স্থল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকে ধারাবাহিক ভাঙনে শত শত একর কৃষিজমি, অসংখ্য বসতভিটা, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও নিম্নআয়ের বেশ কিছু পরিবার এখনও সেখানে বসবাস করছে।
গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম হাওলাদার বলেন, একসময় তাদের অনেক জমিজমা ছিল। নদী সব কেড়ে নিয়েছে। এখন যে সামান্য জায়গায় বসবাস করছেন, সেটিও যে কোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে—এই আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটছে।
রাবেয়া বেগম বলেন, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। ঝড়-বৃষ্টির সময় নৌকা চলাচল বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, বাজার, চিকিৎসা, সরকারি সেবা কিংবা শিশুদের বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে প্রতিদিন নৌকা বা ট্রলার ব্যবহার করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে উত্তাল নদী ও বৈরী আবহাওয়ায় দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেক সময় জরুরি রোগীকেও সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, নিরাপদ যোগাযোগ ও দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রেরও ঘাটতি রয়েছে।
যোগাযোগ সংকট ও পরিবার স্থানান্তরের কারণে গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে সেখানে মাত্র ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
রানাপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাকির হোসেন বলেন, ইসলামাবাদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে অবশিষ্ট গ্রামটুকুও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইসলামাবাদ মূল নদীতীরের বাইরে মাঝনদীর একটি দ্বীপসদৃশ এলাকায় অবস্থিত। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড মূলত নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। ফলে সেখানে সরাসরি ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প গ্রহণে আইনি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের মাধ্যমে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিশেষ বিবেচনায় আনা হলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিজভী আহমেদ সবুজ বলেন, বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষের দুর্ভোগ প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা নয়, স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে কয়েক বছরের মধ্যেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে ইসলামাবাদ গ্রাম।
এমএস/